
2026-09-11 | শিরোনাম,পশ্চিমবঙ্গ,Viral ,রাজ্য, | Kaliachak Sangbad | Views : 12
এম নাজমুস সাহাদাত :- একদিকে ঘরের উঠোনে জল। অন্যদিকে চোখের সামনে এগিয়ে আসছে নদী। কোথাও রাস্তা কেটে গিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, কোথাও চাষের জমি তলিয়ে গিয়েছে বন্যার জলে। কোথাও আবার গবাদি পশু নিয়ে বাঁধের উপর আশ্রয় নিয়েছেন মানুষ। জল বাড়ছে, সঙ্গে বাড়ছে ভাঙনের আতঙ্কও। গত বছরের ভয়াবহ স্মৃতি এখনও টাটকা। তার মধ্যেই ফের গঙ্গার অস্বাভাবিক জলস্তর বৃদ্ধিতে মালদহের বিস্তীর্ণ নদীতীরবর্তী এলাকায় তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। দিন যত গড়াচ্ছে, ততই বদলে যাচ্ছে নদীপাড়ের মানুষের জীবনযাত্রার ছবি। কালিয়াচক-৩ ব্লকের কৃষ্ণপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের হোসাইনপুর যেন সেই আশঙ্কারই এক প্রতিচ্ছবি। গঙ্গার জলের ধাক্কায় মূল রাস্তার একটি অংশ কেটে যাওয়ায় কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা। গত চার-পাঁচ দিন ধরে পারলালপুর, হোসাইনপুর, মনডায়, পার দেওনাপুর, শোভাপুর-সহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় জল ঢুকতে শুরু করেছে। বহু চাষের জমি ইতিমধ্যেই জলের তলায়। কোথাও কোথাও বাড়ির বারান্দা পর্যন্ত উঠে এসেছে জল। তার সঙ্গে দেখা দিয়েছে পানীয় জলের সমস্যাও। রাস্তা কেটে যাওয়ার জায়গায় সাধারণ মানুষের যাতায়াতের জন্য প্রশাসনের তরফে দুটি নৌকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছর রাস্তার কাজ হওয়ার পরেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। নিম্নমানের কাজের কারণেই ফের গঙ্গার জলের চাপে রাস্তার একটি অংশ ভেঙে গিয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের। কালভার্ট নির্মাণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বাসিন্দাদের একাংশ। তাঁদের দাবি, রাস্তা ও কালভার্টের কাজ যথাযথভাবে করা হলে জলের চাপে এভাবে রাস্তা কেটে যেত না। দ্রুত প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। গঙ্গার জলস্তর বৃদ্ধির প্রভাব শুধু কালিয়াচক-৩-তেই সীমাবদ্ধ নয়। বৈষ্ণবনগর বিধানসভা এলাকার নদীতীরবর্তী গ্রামগুলিতেও পরিস্থিতির খোঁজ নিতে শুরু করেছে রাজনৈতিক দলগুলি। বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীপুর অঞ্চলের ভাঙাটোলা এবং বীরনগর-১ নম্বর অঞ্চলের দুর্গারামটোলা, লালুটোলা ও ভীমাগ্রাম পরিদর্শন করেন বিজেপির দক্ষিণ মালদহের সভাপতি অজয় গাঙ্গুলি ও সাধারণ সম্পাদক নীলাঞ্জন দাস। নদীতীরবর্তী মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাঁরা জলস্তর, ভাঙন ও বন্যা পরিস্থিতির খোঁজ নেন। দুর্গত পরিবারগুলির অভাব-অভিযোগও শোনেন তাঁরা। বিজেপির দক্ষিণ মালদহের সভাপতি জানান, এর আগে মানিকচক ও ইংরেজবাজারের বিভিন্ন গঙ্গাভাঙন ও বন্যাকবলিত এলাকাও তাঁরা পরিদর্শন করেছেন। এবার কয়েক দিন ধরে বৈষ্ণবনগরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে মানুষের সমস্যার কথা জানার চেষ্টা করা হবে। পরে সেই রিপোর্ট সরকারের কাছে তুলে দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। তবে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের ছবি উঠে আসছে ইংরেজবাজারের খাসকোল রবিদাস পাড়া থেকে। প্রায় এক মাস ধরে সেখানে গঙ্গাভাঙন চলছে। ইতিমধ্যেই বহু পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। অনেকে ঘরবাড়ি ভেঙে নিরাপদ জায়গায় সরে গিয়েছেন। কেউ আশ্রয় নিয়েছেন খাসকোল হাইস্কুলের ত্রাণশিবিরে। স্থানীয়দের দাবি, গত দশ বছরে এমন ভয়াবহ ভাঙন তাঁরা দেখেননি। প্রতিদিন নদী যেন আরও একটু করে এগিয়ে আসছে। বসতভিটে, জমি, রাস্তা এক এক করে চলে যাচ্ছে গঙ্গার গ্রাসে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জলস্তর। এই পরিস্থিতিতে বিজেপির দক্ষিণ মালদহের সভাপতি অজয় গাঙ্গুলি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, জলস্তর বৃদ্ধি বন্ধ না হলে খাসকোল এলাকা দিয়ে গঙ্গার জল মালদহ শহরের দিকে ঢুকে পড়তে পারে। তাঁর দাবি, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে ১৯৯৮ সালের বন্যার থেকেও ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে। যদিও এটি তাঁর আশঙ্কা ও বক্তব্য, পরিস্থিতির বাস্তব প্রভাব জলস্তর ও নদীর গতিপথের উপরই নির্ভর করছে। রতুয়া-১ ব্লকের মহানন্দটোলা ও বিলাইমারি এলাকাতেও বন্যা পরিস্থিতির ক্রমশ অবনতি হচ্ছে। গঙ্গা ও ফুলহর নদীর জল একত্রিত হয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করেছে। কাহালা অঞ্চলের নরোত্তমপুর দিয়ারার ৭৩ ও ৭৪ নম্বর বুথও জলমগ্ন। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রায় এক হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু পরিবার গবাদি পশু নিয়ে বাঁধের উপর আশ্রয় নিয়েছে। জলবন্দি মানুষের স্বাভাবিক জীবন কার্যত থমকে গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বুধবার নৌকায় করে দুর্গত এলাকায় পৌঁছে পরিবারগুলির হাতে ত্রিপল, চিড়ে, গুড়, পানীয় জল ও প্রয়োজনীয় ওষুধ-সহ বিভিন্ন ত্রাণসামগ্রী তুলে দেন সমাজসেবী অভিষেক মিশ্র। জলে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া মানুষের কাছে নৌকায় করে প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছনোয় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে দীর্ঘদিন জলবন্দি থাকার আশঙ্কায় আরও ত্রাণ এবং নিরাপদ আশ্রয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বৃহস্পতিবার সেই মহানন্দটোলা ও বিলাইমারি এলাকার পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন মালতীপুরের বিধায়ক আব্দুর রহিম বক্সী। ইঞ্জিনচালিত নৌকা, ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের স্পিডবোট এবং কোথাও পায়ে হেঁটে তিনি দুর্গত মানুষের কাছে পৌঁছন। মহানন্দটোলার কালিতলা স্ট্যান্ডে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে কাটাহাদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ত্রাণশিবিরে গিয়ে আশ্রয় নেওয়া মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের সমস্যার কথা শোনেন। বিধায়ক জানান, পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক। জল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনও অব্যাহত রয়েছে। তাঁর দাবি, এলাকায় প্রায় ১৫ হাজার পরিবার এবং লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রশাসনের তরফে ত্রাণের ব্যবস্থা করা হলেও পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে আরও পর্যাপ্ত ত্রাণের প্রয়োজন রয়েছে। আর ভূতনীতে যেন বন্যার আরেক অধ্যায়। সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই গঙ্গার জলে প্লাবিত মানিকচকের ভূতনীর তিনটি অঞ্চল। বহু মানুষ জলবন্দি হয়ে পড়েছেন। কোথাও নৌকায় করে যাতায়াত, কোথাও নৌকাতেই পৌঁছচ্ছে ত্রাণ। বৃহস্পতিবার ব্লক ও জেলা প্রশাসনের আধিকারিকদের সঙ্গে নিয়ে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করেন মানিকচকের বিধায়ক গৌড়চন্দ্র মণ্ডল। বিভিন্ন এলাকায় নৌকায় করে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়। ভূতনীর পরিস্থিতি পরিদর্শনে মুখ্যমন্ত্রী আসবেন বলেও জানান বিধায়ক। তবে সফরের দিন এখনও চূড়ান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি। মালদহের নদীপাড়ের এই ছবিগুলির মধ্যে জায়গার পার্থক্য থাকলেও দুর্ভোগের ভাষা একই। কারও ঘর জলের তলায়,
